ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিমণ্ডল ছাপিয়ে বৈশ্বিক অর্থনীতির পর্যবেক্ষকদের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে মার্কিন কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভে (ফেড) দেশটির প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হস্তক্ষেপের আশঙ্কা। পুঁজিবাজারে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ওয়াল স্ট্রিটের বিনিয়োগকারীরা। যেকোনো সময় বড় ধসের আশঙ্কা করছেন তারা, যা সংক্রমিত হতে পারে বিশ্বের অন্যান্য বাজারেও। রিজার্ভ ডলারের হিস্যা কমাচ্ছে বিশ্বের অন্যান্য দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বিনিয়োগ ফান্ডগুলোও ডলারের পরিবর্তে অন্যান্য মুদ্রা বা সম্পদে তহবিল স্থানান্তর শুরু করেছে। একই সঙ্গে মনিটারি রেজিম বা মুদ্রার প্রবাহ ও মান কাঠামোয় সরকারি হস্তক্ষেপের বিষয়টি বিশ্বে অন্যান্য স্থানের জন্য নতুন কোনো নজির তৈরি করছে কিনা, সে বিষয়েও প্রশ্ন উঠছে নতুন করে। সার্বিকভাবে গোটা বিষয়টিই বৈশ্বিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতাকে ঠেলে দিয়েছে প্রশ্নের মুখে।
ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে হোয়াইট হাউজ এবং ফেড নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে যে ভারসাম্য বজায় রেখে আসছে, তা এখন প্রকাশ্য দ্বৈরথে রূপ নিয়েছে। বর্তমান এ পরিস্থিতিকে অনেক অর্থনীতিবিদ তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানের হস্তক্ষেপজনিত চরম অর্থনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে তুলনা করছেন।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও ফেড প্রধান পাওয়েলের এ বিবাদের মূল কারণ হলো ঋণের সুদহার। ট্রাম্প চান ফেড যেন সুদহার দ্রুত কমিয়ে ১ শতাংশে নামিয়ে আনে। তিনি মনে করছেন, সুদহার কমলে মানুষের জন্য ঋণ গ্রহণ সহজ হবে। এতে বাজারে নগদ অর্থের প্রবাহ বাড়বে এবং ঝিমিয়ে পড়া মার্কিন অর্থনীতিতে নতুন গতি ফিরবে। আর ফেড প্রধান জেরোম পাওয়েল মনে করেন, এভাবে সুদহার কমানো অর্থনীতির জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। তাই তিনি কোনো রাজনৈতিক চাপের কাছে মাথা নত করতে রাজি নন।
অপরিকল্পিতভাবে সুদহার কমানো হলে দীর্ঘমেয়াদে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়বে বলে মনে করেন পাওয়েল। তার এ অনড় অবস্থান ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করেছে। প্রকাশ্যে পাওয়েলকে ‘জেদি’ ও ‘নির্বোধ’ বলেও সম্বোধন করেছেন তিনি। বিশ্লেষকরা বলছেন, একদিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতা টিকিয়ে রাখা, অন্যদিকে প্রেসিডেন্টের ইচ্ছা—এ দুইয়ের মাঝে এখন এক বিশাল দেয়াল তৈরি হয়েছে।
সম্প্রতি নতুন রূপ নিয়েছে ট্রাম্প-পাওয়েল দ্বন্দ্ব। মার্কিন বিচার বিভাগ এখন ফেড প্রধান জেরোম পাওয়েলের বিরুদ্ধে একটি ফৌজদারি অভিযোগ তুলে তদন্ত শুরু করেছে। ফেড সদর দপ্তরের সংস্কারকাজে প্রায় ২৫০ কোটি ডলার অতিরিক্ত খরচ হওয়ার অভিযোগে এ তদন্ত চলছে। তবে পাওয়েল এ তদন্ত সত্ত্বেও কঠোর অবস্থান ধরে রেখেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন তদন্ত প্রক্রিয়াটি আসলে একটি ‘অজুহাত’। মূলত তাকে ভয় দেখিয়ে সুদহার কমাতে বাধ্য করার জন্যই ট্রাম্প প্রশাসন বিচার বিভাগকে ব্যবহার করছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অর্থনীতিতে প্রভাব বিস্তার করা এ দুই ব্যক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব সারা বিশ্বের বিনিয়োগকারীদের মধ্যে আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। যদিও ওয়াল স্ট্রিট এখন পর্যন্ত বড় কোনো ধসের মুখে পড়েনি, তবে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত হয়ে পড়েছেন।
পিআইএমসিওর মতো বিশ্বের বড় বিনিয়োগ ফান্ডগুলো এখন থেকেই ডলারের ওপর ভরসা কমিয়ে দিচ্ছে। বরং ফান্ডগুলো কয়েক লাখ কোটি ডলারের তহবিল ডলারের বদলে অন্য কোনো দেশের মুদ্রা বা সম্পদে সরিয়ে নিতে শুরু করেছে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও আইএমএফের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ গীতা গোপীনাথ মনে করেন, পরিস্থিতি এখন বেশ উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। তার মতে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর এ ধরনের সরাসরি আক্রমণ যুক্তরাষ্ট্রের ‘আইনের শাসন’ এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক নেতৃত্বের ওপর বড় আঘাত।
ফেডারেল রিজার্ভ ও হোয়াইট হাউজের এ সংঘাতের ভবিষ্যৎ এখন মার্কিন সুপ্রিম কোর্টের রায়ের ওপর নির্ভর করছে। ফেড গভর্নর লিসা কুককে ট্রাম্প বরখাস্ত করতে চেয়েছিলেন। আদালত এখন ঠিক করবে যে প্রেসিডেন্ট চাইলেই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীন কর্মকর্তাদের সরিয়ে দিতে পারেন কিনা। পাওয়েলের ফেড চেয়ারম্যান হিসেবে বর্তমান মেয়াদের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি আছে। ট্রাম্প চাইছেন পদটিতে নিজের কোনো অনুগত ব্যক্তিকে বসাতে। তবে রাজনৈতিক চাপে যদি কেন্দ্রীয় ব্যাংককে নিয়ন্ত্রণ করা হয়, তবে বিশ্বজুড়ে মানুষ মার্কিন ডলারের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলতে পারে।
ডাচ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক প্রধান ক্লাস নট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র একসময় মুক্ত বিশ্বের অর্থনৈতিক আদর্শ ছিল। কিন্তু বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ সে ভাবমূর্তিকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছে।’
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্প ও পাওয়েলের লড়াই বিশ্ব অর্থনীতিকে এক অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এর প্রভাব ট্রাম্প প্রশাসনের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ব অর্থনীতিকে ভোগাতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।